ইসলাম এবং কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড (একটি রিপোর্টযোগ্য পর্যালোচনা)

আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ইসলাম ধর্মমতে ছবি আঁকা বারণ? কিন্তু কেন বারণ সেটা জানেন কী? এর উত্তর আমি খুঁজে পেয়েছি গতকাল। ইসলামিক হাদিথে যে গল্পকথা লেখা আছে তা ইলাস্ট্রেট করলে ফেসবুকে পোস্ট করা যায় না। করলে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে’ আটকায়।

(অবশ্য বেশী জেদাজেদী করলে, মানে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের’ আইনকানুন নেই এরকম মিডিয়াতে সেসব এঁকে পোস্ট করতে চাইলে, কী হয় তা আমরা চার্লি হেবডোর কেস থেকে জানতে পারি।)

তা কেন আটকায় কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে? টুপিদাড়িওয়ালা (!!!) ন্যাংটো (!!!!) লোকের কোলে ন্যাংটো বাচ্চা মেয়ে (!!!!!!!!!)। কতরকমের আউটরেজ যে একসাথে ঘটে যাচ্ছে এক্ষেত্রে, কত টাইপের ভাবাবেগ যে আহত হয়ে মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে, জাস্ট ভাবা যায় না। ফেসবুক সম্ভবত স্রেফ ‘চাইল্ড পর্নোগ্রাফি’ বলেই আটকাতে চাইবে এই কার্টুনটাকে। কিন্তু এই যে আমি কাল dhormockery.com থেকে এই কার্টুনটা (টুপিদাড়িওয়ালা লোকের কোলে ন্যাংটো বাচ্চা মেয়ে) খুঁজে সেটা পোস্ট করলাম ফেসবুকে, আর তারপর আহত ভাবাবেগ রিপোর্ট করে আমার পোস্ট উড়িয়ে দিল, এই কার্টুনটা কী কারো মস্তিষ্কপ্রসূত পানু? আজ্ঞে না। একেবারেই না। এটা নেহাৎই একটি ইলাস্ট্রেশন। বিশুদ্ধ ধর্মীয় ইলাস্ট্রেশন।

শাহী আল-বুখারী হাদিথের সাত নম্বর ভল্যুমের ৬২ নম্বর কেতাবের ৬৪ নম্বর সুরায় যা বলা হয়েছে, এই কার্টুন তার চেয়ে এক চুলও বেশী বলেনি। কী বলছে এই সুরা?

বলছে, যে নবী মোহাম্মদ যখন আয়েশাকে বিবাহ করেন, তখন আয়েশার বয়স ছয় কি সাত। কিন্তু তাঁর দয়ার শরীর তো, তাই বিয়ে করা মাত্রই তিনি এই বালিকার সাথে যৌনক্রীড়া শুরু করেননিই বটে। খুব কষ্ট করে অপেক্ষা করেছিলেন আরো দু-তিন বছর। মোহাম্মদ আয়েশার সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হন আয়েশার নয় অথবা দশ বছর বয়সে (যখন সে রজস্বলা হয়)। এই সময়ের পর আরো ন’বছর বেঁচে ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী। এমনই বলে গেছেন তাঁর জীবনীকার, ইবন হাশিম। নবী মারা যান ৬২ বা ৬৩ বছর বয়সে। অর্থাৎ, আয়েশার সাথে বিছানায় যাওয়ার সময়ে নবীর বয়স ছিল ৫৩ অথবা ৫৪। ইসলামের অংক অন্যরকম কিনা জানি না, তবে সাধারণ ক্যালকুলেটর এমনই বলবে।

আরো জেনে নিই, যে ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চের চেয়েও একটু বেশী সম্মান কীভাবে দিয়েছে। এই কেতাবের ৬৭ নম্বর সুরায় বলা হচ্ছে, কোনো ‘ভার্জিন’ (যৌনমিলনের অভিজ্ঞতা হয়নি) নারীকে বিবাহ করার আগে তার সম্মতি নেওয়া জরুরি, নবী বলেছেন। অবশ্য, প্রশ্ন উঠেছিল যে তার সম্মতি জানা যাবে কীভাবে। এই প্রশ্নের উত্তরটাই অসাধারণ। নবী বলেছেন, তার মৌন থাকাকে সম্মতি বলে ধরে নিতে হবে। এবার, প্র‍্যাক্টিক্যালি ব্যাপারটা একবার ভাবা যাক। একটি আট বছরের মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘মা, তুমি বিবাহে সম্মত তো?’ সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। অতঃপর, তার বিয়ে হয়ে গেল।

এবার, যে কোলাজটা দিয়েছি এখানে তার প্রথম ছবিটা দেখুন। ওইটাই সেই রিপোর্ট-লাঞ্ছিত কার্টুন, যেটা dhormockeryও, আমার ধারণা, কোনো এক বিশেষ কারণে তুলে নিয়েছে। শাহী আল-বুখারী হাদিথের সাত নম্বর ভল্যুমের ৬২ নম্বর কেতাবের ৬৪ নম্বর সুরায় যা বলা হয়েছে কার্টুনটা তার থেকে কী তিলমাত্রও বেশী দেখাচ্ছে? যদি একটা কার্টুন হাদিথের সুরায় যা লেখা আছে শুধু সেইটুকু এঁকে দেখায়, তাহলে কমিউনিটি এমন উদ্বেল হয় কেন, এই মূর্খ মহিলার বোধের বাইরে।

নবী মোহম্মদ যে আদতে একজন পিডোফাইল (শিশুকামী) ছিলেন এ কথা পরিস্কার করে লেখা আছে মুসলমানদের নিজ ধর্মগ্রন্থেই। কিন্তু তা স্পষ্ট করে বললেই ইসলামের ‘ভাবাবেগে’ এমন আঘাত লাগে, যে আঘাতের চোটে চাপাতি শানিয়ে ওঠে। নাস্তিক ব্লগার থেকে শুরু করে মুক্তমনা সাংবাদিক, কেউই এই পবিত্র চাপাতির রহমৎ থেকে বাদ যায় না। কিন্তু তাই বলে তো মানুষ পড়তে ভুলে যাবে না, তাই না?

আপনি হয়ত ভাবছেন, এসব প্রাচীন ঘটনা, এসব এখন ঘাঁটানোর কী আছে? আজ্ঞে, আছে, কারণ ঘটনা প্রাচীন হলেও মানসিকতাটি আজকের দিনেও ভরপুর বর্তমান। বাংলাদেশের কথা বাদ দিন, এই ক’দিন আগেই ভারতবর্ষের মাটিতেই উঠেছে ‘শরিয়া কোর্টের’ দাবী। তিন তালাক আর নিকাহ হালালার মত সাংঘাতিক নারীবিদ্বেষী রীতিকে প্রশ্ন করার জন্য ফতোয়া জারি হয়েছে একজন ভারতীয় মুসলিম মেয়ের বিরুদ্ধে। এবং ভারতবর্ষে এখনো ‘মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ বলে একটা বিষয় এক্সিস্ট করে, যার আইন অনুযায়ী ভারতীয় মুসলিম মেয়েরা বিবাহযোগ্যা হয় ১৪ বছর বয়সে, যেখানে বাকী ভারতের সমস্ত মানুষের জন্য বিবাহযোগ্য হওয়ার বয়েস ১৮. আজ্ঞে না, এটা ‘ওদের’ ব্যাপার নয়। এটা আমার ব্যাপার। কারণ আমি নাস্তিক হতে পারি, কিন্তু ভারতীয়।

এই কয়েকদিন আগেই খোন্দকার নামে এক সাচ্চা মুসলমান এই ফেসবুকেরই পবিত্র ভূমিতে জাহির করেছেন, যে মেয়েদের বিয়ে করার জন্য তাদের ১৮ বছর বয়েস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, এ বড়ই অত্যাচার। আট-ন বছরের মেয়েরা যথেষ্ট বিবাহযোগ্য। তাঁর পোস্ট, যতদূর জানি, ফেসবুকে এখনো বিদ্যমান। ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ এই মহান সাহসী ব্যক্তিকে চুপ করাতে পারেনি কিন্তু। তাঁর ওপর নবীর রহমৎ আছে যে!

যাই হোক, এই নিয়ে নাকেকান্না আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য স্রেফ একটি প্রশ্ন করা সেইসব ‘প্রগতিশীল নারীবাদী’দের, যাঁরা বোরখা পরার অধিকার নিয়ে লড়ে যান, এবং ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বললেই যাঁরা ‘রেসিস্ট’, ‘রিগ্রেসিভ’, ‘দাঙ্গাবাজ’, ‘চাড্ডী’, ইত্যাদি বিভিন্ন কিছু বলে ডেকে থাকেন আমাকে। আপনারা যা করেন তা জেনেশুনেই করেন তো? জেনেশুনেই একটি এমন ধর্মকে ডিফেন্ড করেন যার ‘প্রফেট’ একজন পিডোফাইল? তাই তো?

মুসলমানকে ঘৃণা না করলেই ইসলামকে ডিফেন্ড করতে হবে কেন? আমি যদ্দূর জানি, dhormockery’র নির্মাতা একজন বাংলাদেশী নাস্তিক, যিনিও জন্মসূত্রে মুসলমান। অবশ্য ইসলাম অনুযায়ী তিনি অবশ্যই ‘মুর্তাদ’ (বিধর্মী)। যেমন ছিলেন মির্জা গালিব অথবা সাদত হাসান মান্টো, ইসমৎ চুঘতাই, তসলিমা নাসরিন। তসলিমা নাসরিনকে রক্ষা করতে এই তৎপরতা তো দেখা যায়নি আপনাদের?

‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দটা ব্যবহার করে আর ঠিক কি কি জাস্টিফাই করা হবে, সত্যিই জানতে ইচ্ছে করে।

তালাক-এ-বিদ্দত এবং নিকাহ হালালা’র নিয়ম অনুযায়ী একটি মেয়েকে তার শ্বশুরের সাথে যৌনমিলনে বাধ্য করা হয়েছিল। মেয়েটিকে তার শ্বশুর ধর্ষণ করে। মেয়েটির নাম নিদা খান। একটিই মেয়ের গল্প নয় কিন্তু এটা। ভারতবর্ষেই এ জিনিস বেশ ব্যাপকভাবে চলছে। সবাই মুখ খুলতে সাহস করে না। নিদা খান তা করেছে। সে কোরান এবং হাদিসের বিরুদ্ধেই কথা বলেছে। যদিও, তার মূল্যায়ণে স্লাইট ভুল আছে। ‘নিকাহ হালালা’ হাদিস সম্মতই বটে। এই নিয়ম অনুযায়ী, স্ত্রীকে একবার তালাক দিয়ে তাকে আবার বিয়ে করতে হলে প্রথমে তাকে অন্য এক পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে হবে। সেই দ্বিতীয় বিয়েতে তালাকপ্রাপ্ত হলে তবেই সে আবার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরতে পারে। শুনে মনে হচ্ছে, এ তো পুরুষটিরই শাস্তির বিধান। কিন্তু বাস্তবে এই আইন ব্যবহার করে একটি নারীকে পরিবারের বিভিন্ন পুরুষের যৌনসংগী হতে বাধ্য করা হয়। এই ক’দিন আগেই আরেকজন নিকাহ হালালার ভিক্টিমের কথা জানা গিয়েছিল যাকে শ্বশুর, ভাসুর, এবং একাধিক পুরুষ এই ছুতোয় ধর্ষণ করে।

নিদা খান এই প্রথার বিরোধিতা করায় ভারতবর্ষেরই দুই মৌলানা তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছে। সে কোরান আর হাদিসের বিরুদ্ধে গেছে বলে অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা হবে না, মারা গেলে ‘জনাজা’ হবে না, এবং তাকে কবর দেওয়া হবে না। ধর্ষণের বিরোধিতা করার জন্য আগে কখনো শুনেছেন যে একজন ভারতীয় মেয়ের বিরুদ্ধে ‘ফতোয়া’ জারি করা যায়? মিডিয়া গিয়েছিল এই মৌলবীদের সাথে কথা বলতে। এই মৌলবীদের সমর্থক কিছু ‘সহি মুসলমান’ মহিলা একজন মহিলার বিরুদ্ধেই যে কথাগুলো বলেছেন, তা সত্যিই দ্রষ্টব্য।

“We have complete faith in Quran and Hadith. Our constitution has given us the right to preach the religion of our choice and if the Constitution goes against our Quran or Hadith, we will go against the Constitution.”

অর্থাৎ, ভারতীয় কন্সটিটিউশন যদি কোরানের বিরুদ্ধে যায়, এঁরা তাহলে সংবিধানের বিরুদ্ধে যাবেন। ভারত একটি সেক্যুলার গণতন্ত্র। সেখানে প্রত্যেক ধর্মের মানুষের ধর্মাচরণ করার সমান অধিকার নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু সেই ‘ধর্মাচরণ’ যদি কন্সটিটিউশন অনুযায়ী বে-আইনি হয়, তাহলেও সেই অধিকার রয়েছে কী? যদি থাকে, তাহলে কুলীন ব্রাহ্মণের বহুবিবাহকেও তো স্বীকৃতি দিতে হবে। সেটা দেবে তো আইন?

এখন, এই প্রশ্নগুলো তোলার নাম হবে ‘ইসলামোফোবিয়া’। যেমন, এক ভারতীয় সম্রাটের চতুর্থ স্ত্রী যদি চোদ্দখানা বাচ্চা বিয়োনোর পর গত হন, তাহলে সম্রাটের তাঁর প্রতি ‘প্রেম’ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা নাকী ‘ইস্লামোফোবিয়া’। সেরকমই বলতে চাইছে এক দৈনিক সংবাদপত্রের ঘৃণ্য একটা লেখা। মুসলিমদের হোমোফোবিয়াকে প্রশ্ন করাকেও ইসলামোফোবিয়া বলা হবে তবে??

আমি নারীবাদী হিসেবে খুব ওপেনলি ডিক্লেয়ার করে রাখতে চাই যে আমি ইসলাম-বিরোধী। এখানে ‘ফোবিয়ার’ কিছু নেই। কোরান-হাদিসের বিরুদ্ধে ওপেনলি বলার জন্য যে ধর্ম কারো বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতে পারে, সে ধর্ম সম্পর্কে ভয় আদতে অমূলক নয়।

Image copyright: dhormockery.com

Advertisements

অতঃপর যাত্রা শুরু হইল। স্যাক্সোফোন বাজিয়া উঠিল পশ্চাতে…

Image copyright: A. Sarkar

নাস্তিক বড়ই হারামি প্রাণী। মরার পর এই হতভাগী যখন জানতে পারবে, ঈশ্বর, আল্লা, গড, সব্বাই আছে, তখন এই পোড়ামুখীর ওপর কেমন গজবটাই না পড়বে, চিন্তা করুন একবার!

তাই যে ক’টা দিন বেঁচেবর্তে আছে, সার্কাসটা ভালো করে দেখে নিন এইবেলা। এই সার্কাসের টিকিটও নাই। সম্পূর্ণ বিনামূল্যের থ্যাটার। কোন আহাম্মক বলেছিল, ওতে নাকী লোকশিক্ষে হয়!

A woman who knows the worth of her words is worth a thousand men who know words of great worth.